ঢাকা ০৩:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়ার চৌধুরী পরিবারের সন্তান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অজানা কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

সফিকুল আলম চৌধুরী ছাত্র জীবনে ছিলেন তুখোড় ছাত্র নেতা। পরবর্তীকালে তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে যোগ দেন। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত আলম চৌধুরী একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে মার্চ মাসে তিনি বোদা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে অস্ত্র-চালনার প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের কাছে ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হন। তাকে ধরার জন্য ওই এলাকার রাজাকার ও শান্তিকমিটির নেতারা পুরস্কার ঘোষণা করে। এ পরিস্থিতিতে তিনি গোপনে লড়াই চালানোর প্রস্তুতি নেন। অবশেষে একদিন তিনি পুলিশের চোখে ধরা পড়ে যান। সেদিনটি ছিল ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পরের দিন তাকে বোদা থানায় নিয়ে গেলে সেখানে তিনি একটি চেয়ারে বসেন। তা দেখে একজন অবাঙালী পুলিশ এসে তাকে চেয়ার থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয় এবং বলে, “শালে কিঁউ কুরসি মে বইঠা হায়”। বোদা থানা থেকে তাঁকে হাত-পা ও চোখ বেঁধে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেখানে একজন লোক পাঞ্জাবী সেনাদের জিজ্ঞেস করে ‘ইয়ে কোন হ্যায়?’ সেনাদের একজন জবাবে বলল, “ইয়ে মুক্তিকা কর্নেল হ্যায়”। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তার পেটে ভীষণ জোরে একটা লাথি মারে। সারাদিন সারারাত অভুক্ত থাকার কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

জ্ঞান ফিরলে তাকিয়ে দেখেন, একটি বাঘের খাঁচায় দুটি বড় এবং দুটি বাচ্চা বাঘের মাঝে তিনি শুয়ে আছেন। চোখ খোলার সাহস নেই। মনে মনে ভাবেন বাঘ দিয়েই তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য বাঘ চারটি সরে গিয়ে খাঁচার পার্টিশন পার হয়ে একপাশে গিয়ে বসে থাকলো। একজন লোক এসে পার্টিশনের দরজা বন্ধ করে দিলো। বাঘের এহেন আচরণ দেখে সেনারাও খুব অবাক হলো। কিছুক্ষণ পর এক পাঞ্জাবী সেনা এসে একটি পোড়া রুটি বাঘের প্রস্রাবের উপর ছুঁড়ে মারে। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি সেটিই খান। এরপর তাকে বাঘের প্রস্রাব মেশানো পানি খেতে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায়ও তাঁকে পোড়া রুটি খেতে দেওয়া হয়। রুটি খেয়ে তিনি মেঝেতে বুক লাগিয়ে শুয়ে পড়েন। এমন সময় একটি বাঘের বাচ্চা এসে তার দু’পায়ের মাঝখানে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। নির্ঘুম সারা রাত তাঁর এভাবেই কেটে যায়। কিন্তু কি আশ্চর্য বাঘ তাঁকে কিছুই করে না!

সকালে তাকে বাঘের খাঁচা থেকে বের করে আনা হয় এবং যথারীতি একটি পোড়া রুটি খেতে দেওয়া হয়। তাঁর দু’হাত বেঁধে ফেলে এক পাঞ্জাবি সেনা তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুম কোন পার্টি করতা হ্যায়”? তিনি জবাব দেন তিনি ওয়ালী খানের ন্যাপ পার্টি করেন। তখন সে লোকটি রেগে মেগে বলে, ”বাইনচোত, তুম গাদ্দার হায়। ওয়ালী খান ভি গাদ্দার হায়।” এর পর সে আরও জিজ্ঞেস করে, “আন্দার মে কেতনা মুক্তি হায়”? তিনি বলেন, তিনি জানেন না। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি তাকে বেত দিয়ে মারা শুরু করে। মারের চোটে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরলে দেখেন তিনি আবার বাঘের খাঁচায় এবং একটি বাঘ তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবারও বাঘ তাঁকে কিছু করে না। এভাবেই প্রতিদিন তার উপর নির্যাতন চালিয়ে আবার বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। আর প্রতি রাতেই একটা বাঘের বাচ্চা তার দু’পায়ের মাঝে মাথা রেখে ঘুমাতো। এর মাঝে একদিন প্রায় ১৫ জন লোককে ধরে এনে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাঘগুলো তাদের আক্রমণ করে দেহ ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের আর্তনাদে আশেপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠে। সন্ধ্যায় তাদেরকে নির্মমভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হয়!

এর মধ্যে একদিন দু’জন মেজর এসে বলে, “শের কো নাড়ো”। বাঘের গায়ে হাত দিতেই বাঘ সরে যায়। তারা আবার বললো, “তোমহারা শির শের কা মু কা পাছ লে যাও”। মাথা বাঘের মুখের কাছে নিয়ে গেলে বাঘ চারটিই সরে গিয়ে খাঁচার এক কোণে বসে থাকে। এর পর তারা বলাবলি শুরু করে, “ইয়ে বহুত শরীফ ল্যাড়কা হায়। ইসকো কিঁউ নাহি ছোড় দেতা হায়”।

এর পর তাকে ঠাকুরগাঁও মহকুমা হাকিমের কোর্টে হাজির করা হলে মহকুমা হাকিম তাঁকে দু’বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু জজ কোর্টে তিনি জামিন পান। জামিন পেয়ে তিনি জেল থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিবেন এমন সময় একটা মিলিটারির গাড়ি এসে তাঁকে আবার ধরে ফেলে এবং একজন মেজর বলে, “শালা তুম ভাগনে কা কোশেশ করতা হ্যায়”। তাঁকে আবার জেলে পুরে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর মুক্তি বাহিনী এবং মিত্র বাহিনী ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশ করলে খান সেনারা পালিয়ে যায়। একজন বাঙালি পুলিশ অফিসার তাঁকে চাবি দিলে তিনি জেলখানার লকআপ খুলে বাইরে চলে আসেন।

এমনই শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি দিয়ে ভরা ছিল তাঁর জীবন।

কিংবদন্তির নায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কমিউনিষ্ট নেতা, পাঁচপীর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সফিকুল আলম চৌধুরী ১২ মার্চ ২০১৮ সালে ৭৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

কৃতজ্ঞ ঃ ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া চৌধুরী  পরিবারের উত্তরসুরী  ব্যারিস্টার নুর উস সাদিক  চৌধুরী, ডেপুটি  অ্যাটর্নি জেনারেল।

ট্যাগস :
জনপ্রিয়

ঠাকুরগাঁওয়ে ভোটের মাঠের বীরযোদ্ধা অরুণাংশু দত্ত টিটো

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়ার চৌধুরী পরিবারের সন্তান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অজানা কথা

আপডেট : ০৮:৩৬:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মার্চ ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

সফিকুল আলম চৌধুরী ছাত্র জীবনে ছিলেন তুখোড় ছাত্র নেতা। পরবর্তীকালে তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে যোগ দেন। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত আলম চৌধুরী একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে মার্চ মাসে তিনি বোদা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে অস্ত্র-চালনার প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের কাছে ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হন। তাকে ধরার জন্য ওই এলাকার রাজাকার ও শান্তিকমিটির নেতারা পুরস্কার ঘোষণা করে। এ পরিস্থিতিতে তিনি গোপনে লড়াই চালানোর প্রস্তুতি নেন। অবশেষে একদিন তিনি পুলিশের চোখে ধরা পড়ে যান। সেদিনটি ছিল ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পরের দিন তাকে বোদা থানায় নিয়ে গেলে সেখানে তিনি একটি চেয়ারে বসেন। তা দেখে একজন অবাঙালী পুলিশ এসে তাকে চেয়ার থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয় এবং বলে, “শালে কিঁউ কুরসি মে বইঠা হায়”। বোদা থানা থেকে তাঁকে হাত-পা ও চোখ বেঁধে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেখানে একজন লোক পাঞ্জাবী সেনাদের জিজ্ঞেস করে ‘ইয়ে কোন হ্যায়?’ সেনাদের একজন জবাবে বলল, “ইয়ে মুক্তিকা কর্নেল হ্যায়”। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তার পেটে ভীষণ জোরে একটা লাথি মারে। সারাদিন সারারাত অভুক্ত থাকার কারণে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

জ্ঞান ফিরলে তাকিয়ে দেখেন, একটি বাঘের খাঁচায় দুটি বড় এবং দুটি বাচ্চা বাঘের মাঝে তিনি শুয়ে আছেন। চোখ খোলার সাহস নেই। মনে মনে ভাবেন বাঘ দিয়েই তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য বাঘ চারটি সরে গিয়ে খাঁচার পার্টিশন পার হয়ে একপাশে গিয়ে বসে থাকলো। একজন লোক এসে পার্টিশনের দরজা বন্ধ করে দিলো। বাঘের এহেন আচরণ দেখে সেনারাও খুব অবাক হলো। কিছুক্ষণ পর এক পাঞ্জাবী সেনা এসে একটি পোড়া রুটি বাঘের প্রস্রাবের উপর ছুঁড়ে মারে। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি সেটিই খান। এরপর তাকে বাঘের প্রস্রাব মেশানো পানি খেতে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায়ও তাঁকে পোড়া রুটি খেতে দেওয়া হয়। রুটি খেয়ে তিনি মেঝেতে বুক লাগিয়ে শুয়ে পড়েন। এমন সময় একটি বাঘের বাচ্চা এসে তার দু’পায়ের মাঝখানে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। নির্ঘুম সারা রাত তাঁর এভাবেই কেটে যায়। কিন্তু কি আশ্চর্য বাঘ তাঁকে কিছুই করে না!

সকালে তাকে বাঘের খাঁচা থেকে বের করে আনা হয় এবং যথারীতি একটি পোড়া রুটি খেতে দেওয়া হয়। তাঁর দু’হাত বেঁধে ফেলে এক পাঞ্জাবি সেনা তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুম কোন পার্টি করতা হ্যায়”? তিনি জবাব দেন তিনি ওয়ালী খানের ন্যাপ পার্টি করেন। তখন সে লোকটি রেগে মেগে বলে, ”বাইনচোত, তুম গাদ্দার হায়। ওয়ালী খান ভি গাদ্দার হায়।” এর পর সে আরও জিজ্ঞেস করে, “আন্দার মে কেতনা মুক্তি হায়”? তিনি বলেন, তিনি জানেন না। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি তাকে বেত দিয়ে মারা শুরু করে। মারের চোটে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরলে দেখেন তিনি আবার বাঘের খাঁচায় এবং একটি বাঘ তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবারও বাঘ তাঁকে কিছু করে না। এভাবেই প্রতিদিন তার উপর নির্যাতন চালিয়ে আবার বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। আর প্রতি রাতেই একটা বাঘের বাচ্চা তার দু’পায়ের মাঝে মাথা রেখে ঘুমাতো। এর মাঝে একদিন প্রায় ১৫ জন লোককে ধরে এনে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাঘগুলো তাদের আক্রমণ করে দেহ ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের আর্তনাদে আশেপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠে। সন্ধ্যায় তাদেরকে নির্মমভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হয়!

এর মধ্যে একদিন দু’জন মেজর এসে বলে, “শের কো নাড়ো”। বাঘের গায়ে হাত দিতেই বাঘ সরে যায়। তারা আবার বললো, “তোমহারা শির শের কা মু কা পাছ লে যাও”। মাথা বাঘের মুখের কাছে নিয়ে গেলে বাঘ চারটিই সরে গিয়ে খাঁচার এক কোণে বসে থাকে। এর পর তারা বলাবলি শুরু করে, “ইয়ে বহুত শরীফ ল্যাড়কা হায়। ইসকো কিঁউ নাহি ছোড় দেতা হায়”।

এর পর তাকে ঠাকুরগাঁও মহকুমা হাকিমের কোর্টে হাজির করা হলে মহকুমা হাকিম তাঁকে দু’বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু জজ কোর্টে তিনি জামিন পান। জামিন পেয়ে তিনি জেল থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিবেন এমন সময় একটা মিলিটারির গাড়ি এসে তাঁকে আবার ধরে ফেলে এবং একজন মেজর বলে, “শালা তুম ভাগনে কা কোশেশ করতা হ্যায়”। তাঁকে আবার জেলে পুরে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর মুক্তি বাহিনী এবং মিত্র বাহিনী ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশ করলে খান সেনারা পালিয়ে যায়। একজন বাঙালি পুলিশ অফিসার তাঁকে চাবি দিলে তিনি জেলখানার লকআপ খুলে বাইরে চলে আসেন।

এমনই শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি দিয়ে ভরা ছিল তাঁর জীবন।

কিংবদন্তির নায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কমিউনিষ্ট নেতা, পাঁচপীর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সফিকুল আলম চৌধুরী ১২ মার্চ ২০১৮ সালে ৭৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

কৃতজ্ঞ ঃ ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া চৌধুরী  পরিবারের উত্তরসুরী  ব্যারিস্টার নুর উস সাদিক  চৌধুরী, ডেপুটি  অ্যাটর্নি জেনারেল।